ডিপ্লোমা শেষে ক্যারিয়ার ভাবনাঃ চাকরি VS উচ্চ শিক্ষা VS আত্ম কর্মসংস্থান

ডিপ্লোমা ক্যারিয়ার

যাদের শীঘ্রই ডিপ্লোমা শেষ হতে যাচ্ছে কিংবা সর্বশেষ সেমিস্টারের রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে তাদের করণীয় নিয়েই আজকের আলোচনা। চাকরি, উচ্চশিক্ষা নাকি আত্ম-কর্মসংস্থান কোনটি সামনের ভবিষৎ-এর জন্য সঠিক হবে ডিপ্লোমা সম্পন্নের দ্বারপ্রান্তে এসে সবারই এই চিন্তা থাকে।

তবে প্রথমেই এই ধারনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে যে,  আপনার পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা কোর্স শেষ হওয়ার পরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে দুর্দান্ত ক্যারিয়ারের প্রচুর সম্ভাবনা। শিক্ষার্থীরা পলিটেকনিক ডিপ্লোমা কোর্স বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল এটি তুলনামুলক কম ব্যয়ে এবং তুলনামূলকভাবে কম সময়ের মধ্যে  ক্যারিয়ারের প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

পলিটেকনিক ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হওয়ার প্রধান কারন হল- ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের কোর্স সম্পন্ন হওয়ার পর পরই  বিভিন্ন পেশায় প্রবেশ করার চমৎকার সুযোগ থাকে। যেসব শিক্ষার্থীদের আর্থিক সমস্যা আছে বা কর্মজীবন তাড়াতাড়ি শুরু করতে চায়, তাদের জন্য পলিটেকনিক অনেকগুলি ক্যারিয়ার বিকল্প নিয়ে আসে যেগুলো যথেষ্ঠ আকর্ষনীয়। ডিপ্লোমা কোর্স শেষে তারা সরকারি সেক্টরে যোগ দিতে, বেসরকারি সংস্থার চাকরি নিতে পারে বা এমনকি নিজের ব্যবসা শুরু করতে এবং আত্ম-কর্মসংস্থান করতে পারে।

চাকরি

ডিপ্লোমা হোল্ডাররা তাদের কোর্স সম্পন্নের পর পরই জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, সহকারী প্রকৌশলী, হোটেলের নির্বাহক, বিপিও সেক্টর এবং অনেক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় যোগ দিতে পারে। প্রকৌশলের বিভিন্ন  শাখা যেমন বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক, ইলেকট্রনিক্স এবং সিভিলে ডিপ্লোমা হোল্ডারদের সরকারী সেক্টরে  যেমন- পাওয়ার প্লান্ত, পিডিবি, পল্লি বিদ্যুৎ, ওয়াসা, পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্র সহ অন্যান্য বৃহত্তম সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে  চাকরির সুযোগ থাকে।

সরকারী চাকরি ছাড়াও  বেসরকারি খাতে  ডিপ্লোমা হোল্ডারদের কাজের সুযোগ আছে। বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থায় ক্লায়েন্ট সার্ভিসিং, বিপিও, ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে (মেকানিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক, কম্পিউটার, সিভিল, আইটি), হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ভ্রমণ ও পর্যটন, ব্যবসা প্রশাসন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা হোল্ডারদের নিয়োগ দেয়া হয়।

উচ্চশিক্ষা

ডিপ্লোমা কোর্সটি শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিএসসি করতে পারে। শুধুমাত্র  ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য  রয়েছে  সরকারি প্রতিষ্ঠান DUET(Dhaka University of Engineering & Technology). এছাড়া ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, IUBAT, গ্রিন ইউনিভার্সিটি সহ আরও কিছু প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বিএসসি করার সুযোগ রয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ডিপ্লোমা হোল্ডারদের জন্য আরেকটি বিকল্প  উচ্চশিক্ষা হল AIME কোর্স করা। বিএসসি ছাড়াও ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর একজন শিক্ষার্থী দেশে AMIE ডিগ্রি অর্জন করতে পারে। AMIE  ডিগ্রি সফল ভাবে অর্জনের পর Institution of Engineers  শিক্ষার্থীদের  AIME সনদ প্রদান করে।

আত্ম কর্মসংস্থান

পলিটেকনিক ডিপ্লোমা হোল্ডারদের জন্য আরেকটি চমৎকার বিকল্প ক্যারিয়ার হল আত্ম কর্মসংস্থান। চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা ছাড়াও ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর সুযোগ রয়েছে আত্ম কর্মসংস্থানের। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দ্বারা প্রদত্ত সকল ডিপ্লোমা কোর্সগুলিতে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়টির ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা  তাদের পছন্দের বিষয়টি সম্পর্কে হাতে-কলমে  শিখতে পারে এবং পরবর্তিতে তাদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার জন্য এই শিক্ষা প্রয়োগ করতে পারে। নিজের লব্ধ জ্ঞান এবং কিছু পুঁজি নিয়ে শুরু করতে পারেন ব্যবসা, খামার এমনকি সার্ভিস প্রদানের কাজ।

উদাহরণস্বরূপ, কম্পিউটার প্রকৌশলে ডিপ্লোমা ধারী একজন ছাত্র সহজেই কম্পিউটার মেরামত জন্য একটি ব্যবসা শুরু করতে পারেন অথবা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমাধারী কেউ নিজের গ্যারেজ বা অটোমোবাইল মেরামতের দোকান শুরু করতে পারে।

আমদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে, উপরের যেকোনো একটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়াটা ঠিক বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেন হবে না সেটা ব্যাখ্যা করছি চলুন।

  • পরিবারের আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষার খরচ চালাতে পারে না। যার কারনে এন্ট্রি লেভেলের চাকরির দিকে অনেকেই ঝুকে যায়। কিন্তু ক্যারিয়ারের ভবিষৎ এক্ষেত্রে উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা বললেই চলে। আপনি যে বিষয়ে ডিপ্লোমা করেছেন সে ক্ষেত্রে যদি কোন উচ্চতর শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ আপনার না থাকে তবে একসময়ে প্রমোশন এবং উচ্চপদে আরোহণের ক্ষেত্রে আপনি বাঁধার সম্মুখীন হবেন।
  • যদিও আপনার পরিবার আপনাকে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য সাপোর্ট দিতে পারে, তাহলেও আপনার শুধুমাত্র পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত হবে না দুটি কারনে। প্রথম কারণটি হল- জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমাদেরই উচিত পরিবারকে সাপোর্ট দেয়া, নেয়া নয়। এবং দ্বিতীয় কারনটি হলো বর্তমানে অভিজ্ঞতা ছাড়া যত সার্টিফিকেটই থাকুক না কেন ভাল চাকরি পাওয়া যায় না। ভাল কোম্পানীতে ভাল পোস্টে ভাল বেতনে চাকরি চাই? উচ্চতর জ্ঞান এবং কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দুটাই সমান দরকারি।
  • যদি আপনি নিজের ব্যবসা অথবা সার্ভিস প্রদানের প্রতিষ্ঠানও থাকে, সেক্ষেত্রে এক পর্যায়ে সেটার পরিধি সম্প্রসারন করা আপনার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে উপযুক্ত জ্ঞানের অভাবে।

বুঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে নিজের ক্যারিয়ারকে যে কোন ক্ষেত্রে ভাল অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে উপরের যে কোন একটি বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা যাবে না। লক্ষ্য থাকতে হবে, ডিপ্লোমার পর জবের জন্য চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে সরকারি হোক বা বেসরকারি, জবের পাশাপাশি বিএসসি করতে হবে সেটা বিবেচনা করে এগোতে হবে। এছাড়া নন ক্যাডার বিসিএস এবং শিক্ষক নিবন্ধনের মত পরীক্ষাগুলোও ভাল চাকরি পেতে আপনাকে সাহায্য করবে। এই পড়ালেখাটাকেই কাজে লাগিয়ে চাকরিতে প্রমোশন পাওয়াটা সহজ হয়ে যাবে আপনার জন্য। প্রতিষ্ঠানের উঁচু পদে চাকরি পাবেন সহজেই।

পলিটেকনিক ডিপ্লোমা এমন একটি ডিগ্রী যা নিজেই আপনাকে  একটি ভাল কাজ পেতে সাহায্য করবে। কিন্তু, কর্মজীবনকে  একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিসর বাড়াতে চাইলে এবং উচ্চ পদের চাকরির জন্য যোগ্য হতে চাইলে স্নাতক অথবা উচ্চতর শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন।

এসব কথার শেষ কথা হল, আপনি সে পথেই এগুবেন যে পথ আপনার কাছে উত্তম মনে হয়। কিন্তু, আপনি যদি আপনার ক্যারিয়ারের শীর্ষে আরোহন করতে চান তবে পলিটেকনিক ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন হওয়ার পরে চাকরির পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষা চালিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here